রাজা মানসিংহের পূজিত দুর্গা - কলমে সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য

 


রাজা মানসিংহের পূজিত দুর্গা 

সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য


রাজস্থানের জয়পুরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য অম্বর দুর্গ। মার্বেল আর খাঁটি রূপোর নকশাদার কপাটের আড়ালে এই দুর্গের ভেতরেই অধিষ্ঠান করছেন কচ্ছোয়া রাজবংশের কুলদেবী ‘শীলা মাতা’। এই মন্দিরের ইতিহাস সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে বাংলার মাটির সঙ্গে।


প্রচলিত ইতিহাস ও লোকশ্রুতি অনুযায়ী, ১৬০৪ (এই সাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিতর্ক আছে) সালে অম্বরের মহারাজা প্রথম মানসিংহ পূর্ব বাংলা অভিযানে যান। বারো ভূঁইয়ার অন্যতম প্রতাপশালী শাসক, যশোহরের রাজা প্রতাপাদিত্যকে পরাজিত করার পর তিনি নদীগর্ভ থেকে উদ্ধার করেন এক সুবিশাল কালো শিলাখণ্ড। সেই বিশেষ শিলাতেই খোদাই করা ছিল দেবী দুর্গার এক অপূর্ব মহিষাসুরমর্দিনী রূপ। মানসিংহ সেই জাগ্রত বিগ্রহ পরম শ্রদ্ধায় বাংলা থেকে নিয়ে গিয়ে অম্বর দুর্গের মূল প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠা করেন।


কিন্তু এই বিগ্রহকে ঘিরে সবচেয়ে বড় রহস্য হলো দেবীর মুখের অভিব্যক্তি। মন্দিরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে—দেবীর মুখমণ্ডল একেবারে সোজা নয়, বরং কিছুটা বাঁকা ও ঘাড় একপাশে হেলানো!


প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর মন্দিরে দেবীকে নিয়মিত বলি নিবেদনের কড়া প্রথা চালু ছিল। একপর্যায়ে মহারাজা মানসিংহ সেই বলিদান পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে চান (কিংবা প্রচলিত রক্তপাতের নিয়মে হস্তক্ষেপ করেন)। লোকগাথা বলে, ভক্তের এই অযাচিত হস্তক্ষেপে দেবী অত্যন্ত রুষ্ট হন এবং মুহূর্তের মধ্যে নিজের মুখটি একপাশে ঘুরিয়ে নেন!


পরবর্তীতে দেবীর ক্রোধ শান্ত করতে রাজপরিবার বিধিমোতাবেক পূজার্চনা সচল রাখে। কিন্তু দেবীর সেই ঘাড় বাঁকিয়ে নেওয়া রূপটি আর কখনো সোজা হয়নি; বিগত চার শতাব্দী ধরে পাথরের শরীরে সেই বিরল অভিব্যক্তি অবিকল রয়ে গেছে।


আধুনিক যুগে ১৯৭০-এর দশকের পর সরকারি নিষেধাজ্ঞায় এখানে যাবতীয় রক্তপাত ও পশুবলি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে সেখানে চলে অহিংস ও ফল-মিষ্টির প্রতীকী নৈবেদ্য। তবে আজও নবরাত্রির পুণ্যলগ্নে যখন লক্ষ লক্ষ ভক্তের ভিড় জমে, তখন রূপোর সিংহাসনে বিরাজমান বাঁকা মুখের ‘শীলা মাতা’ সবাইকে মনে করিয়ে দেন—ভক্তি আর নিয়মের সামান্য বিচ্যুতিতে স্বয়ং ঈশ্বরও নীরব অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারেন।





একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ

close