বলি- দিশা চক্রবর্তী


বলি

দিশা চক্রবর্তী 

অর্না আজ খুব খুশি । প্রতি বছর এর মতো এই বছর ও সে স্কুলে প্রথম হয়েছে ।
অর্না ঘোষ, অসাধারণ মেধাবী ছাত্রী। এই কারণে স্কুলে সকলের কাছেই সে খুব প্রিয় ।স্কুলের অধিকাংশ স্যারেরাই বলেন , অর্নার মতো মেধাবী ছাত্রী এযাবৎ এই অঞ্চলে খুব কমই দেখেছেন ।
তবে, অর্নার এই মেধার কদর কেবল মাত্র স্কুলের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ । বাড়িতে তার মা ছাড়া অন্য কোনো সদস্যের সময় নেই তার এই প্রতিভা নিয়ে মাথা ঘামানোর । তাদের মতে মেয়ে মানুষের , বেশি পড়াশুনা করে কোন লাভ নেই। মেয়ে মানেই জীবন্ত বোঝা , মুরগী পালনের মতো কিছুদিন খাওয়া পরা দিয়ে লালন পালন করো , তারপর অন্যের ঘাড়ে বোঝা চাপিয়ে মুক্ত হও।মেয়েদের নিয়তি তো একটাই পরের ঘরে গিয়ে খুন্তি নাড়ো আর বাচ্ছা মানুষ করো । মেয়ে দের বেশি স্বাধীনতা দেওয়া ,বলা যেতে পারে এক প্রকার গর্হিত অপরাধ।

অর্না বাড়িতে ফিরে আনন্দের সাথে‌ তার মাকে ডাকে,
-" মা...ও মা.....মা ? কোথায় গেলে?"
অর্নার মা তার কাছে এসে নিথর দৃষ্টি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলো ।
-ও মা, আমি এবারও 1st হয়েছি। স্যারেরা বলছিলেন আমি নাকি আমদের জেলার মধ্যে সবথেকে বেশি নম্বর পেয়েছি ।
অর্নার মা কোনো উত্তর দেয় না । নিস্পলক দৃষ্টিতে অর্নার দিকে তাকিয়ে থাকে।
-" কী হল মা! তুমি চুপ করে? তোমার আনন্দ হয়নি?"
এবার অর্নার মা বলে তাকে তাড়াতাড়ি আসতে বললো
অর্না খুব অবাক হয়ে যায়।আজ আবার মায়ের কি হল, তার মা তো এরকম করে না। অর্না কিছু না ভেবেই ঘরে চলে যায়। কিন্তু পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার আনন্দটা কোথাও যেন অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়।
-" মা! আমাকে শাড়ি পরাচ্ছ কেন? আমরা কী কোথাও ঘুরতে যাব.....? ও...বুঝেছি ! স্যারেরা ফোন করে আমার আমার রেজাল্টের কথা বলেছেন নিশ্চয়ই , সেই জন্যই আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবে‌... । কি তাই তো?"
অর্নার মা কোনো উত্তর দেয় না। কিন্তু অর্না এবার একটু নিশ্চিন্ত হয়। মনে মনে খুব আনন্দ ও হয় তার।
এমন সময় অর্নার বাবা ঘরে ঢুকে বলে - " কই গো তোমরা তৈরি তো" ।
অর্না বাবার উদ্দেশ্যে বলে - ও বাবা ... কোথায় নিয়ে যাবে...বল না ...।
হ্যাঁ, মা তোকে একটা দারুণ জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছি । তুই পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিস । তোকে তো ঘুরতে নিয়ে যেতেই হবে। আর দেখ তোর জন্য দেখ নতুন শাড়ি ও কিনে এনেছি। আমি তো জানতাম তুই প্রথম হবি।"
অর্না তো খুব খুশি। শাড়ি পড়ে, খুব সুন্দর ভাবে সেজেগুজে রওনা দেয় তারা।
কিছুক্ষণ পর অর্না দের গাড়িটা একটা বড়ো বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। চারিদিকে কি অদ্ভুত নিস্তব্ধতা । অর্নার বাবা অর্নার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করে। মাঝে একবার পিছন ফিরে তার মা কে চোখের ইশারায় জোরে আসতে বলল।
এই দৃশ্য দেখে সমস্ত প্রকৃতি যেন ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভার মতো মাথা নিচু করে নিঃশব্দ রইল।
অর্ণার বাবা অর্ণাকে নিয়ে এসে দাঁড়ায় এক যজ্ঞ কুণ্ডের সামনে, অর্ণার কানে আসে বিসমিল্লার সানাই । যজ্ঞের গনগনে আগুনের সামনে বসা একজন মাঝ বয়সী লোক ।তার ঠিক পাশেই অর্ণাকে বসিয়ে দেয় তার বাবা।অর্ণা ধাতস্থ হয়ে ওঠার আগেই দেখে,হঠাৎ সেই মাঝ বয়সী লোকটা সিঁদুর দানিটা নিয়ে অর্ণার দিকে এগিয়ে আসছে , ভয়ে বিস্ময়ে অর্না চিৎকার করে ওঠে.....
- " ও মা...! ও আমাকে সিঁদুর প রাতে আসছে কেন?"
তৎক্ষণাৎ অর্ণার বাবার উত্তর এলো-" আজ ওর সাথে তোর বিয়ে।"
- " মা! বাবা এসব কী বলছে? মা..! আমি বিয়ে করব না মা। তুমি বাবা কে বোঝাও না মা! আমি পড়তে চাই মা... আমি.. পড়তে.. চাই.."
অর্ণার মায়ের বুকটা বেদনায় চুরমার হয়ে গেলো.. কিন্তু তিনি কোনো কথা বলতে পারল না , তার বুক ফাটা আর্তনাদ দু ফোঁটা অশ্রু হয়ে ঝরতে লাগল। পিতার অধিকারের সামনে মূল্যহীন হয়ে গেলো মাতৃত্ব। পাষাণ রূপী মহিলা টি জানেন তার কোনো উপায় নেই।
তিনি জানেন তার স্বামী এ অঞ্চলের ক্ষমতা দখলের জন্যে সব কিছু করতে পারে । তাই তো মাঝ বয়সী ব্যবসায়ীর সাথে তার ওই ছোট্ট মেয়েটির বিয়ে দিতে ও‌ দুবার ভাবেনি।
অর্না মৃত্যু কালীন শেষ আর্তনাদ করে উঠলো-" বাবা! আমি পড়তে চাই। বাবা! আমি তোমার কাছে কোন দিন কিছু চাইবোনা"। আমি বিয়ে করবো না .. বাবা।
হয়তো এই করুন আর্তনাদে অপরাধীর ফাঁসির সাজাও মাফ হয়ে যেত, কিন্তু অর্ণার সে ভাগ্য কই । সে যে মেয়ে। অর্ণার বাবা চিৎকার করে বলল- " চুপ করে বস! নিকুচি করেছে তোর পড়াশুনার ! পড়াশুনা !!!!! পড়াশুনা করে লাভ নেই। আমি যা বলব তোকে তাই করতে হবে। মেয়ে দের অতো পড়াশোনা কিসের ... .. । এখন বিয়ে না হলে এত ভালো সম্বন্ধ তোর জন্য আর পাব? আমি যা করছি তোর ভালোর জন্যই করছি।"
অর্না-- " আমার ভালোর জন্য !!!?? না নিজের স্বার্থের জন্যে?"
-" অর্না!"
অর্ণার বাবা চিৎকার করে অর্নাকে মারতে গিয়েও থেমে গেলেন।
অর্না রাগ... বেদনার..ভয়ে..........ঘটনার আকস্মিকতায় সেন্সলেস হয়ে যায় ।

জ্ঞান ফিরে পেয়ে সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক অন্য রূপে। মাথা ভর্তি সিঁদুর আর পায়ে পড়ানো অদৃশ্য লোহার বেড়িতে।.
মনে মনে ভাবল, সত্যিই ...! ! বাবা মা যা করেন, সন্তানদের কল্যাণের জন্যই করেন ।........

দিনের পর দিন এভাবেই শেষ হয়ে যাচ্ছে এক একটি অর্ণার স্বপ্ন, বিশ্বাস, ভরসা, ভবিষ্যত। আর তার সাক্ষী হচ্ছি আমি আপনি। প্রথম কয়েকটা দিন খুব খারাপ লাগার মধ্য দিয়ে কাটলে ও শেষ পর্যন্ত কেউ আমরা মনে রাখছি না তাদের। অথচ বিজ্ঞান ভিত্তিক এই পৃথিবীতে আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের কে স্বাধীন, সভ্য, আলোকিত জগতের মানুষ হিসেবে দাবি করছি। কী অদ্ভুত তাই না??


কলমধারি ঃ-  দিশা চক্রবর্তী একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী । যেখানে বর্তমান যুগের অধিকাংশ ছেলে মেয়েরা মোবাইলে সময় নষ্ট করছে। সেখানে এই ছোট্ট মেয়েটি সাহিত্য কে তার সঙ্গী করে নিয়েছে। মেতেছে সৃষ্টির আনন্দে । লেখা ছোট গল্প "বলি" এই লেখা দিয়েই তার সাহিত্য চর্চার যাত্রা শুরু হল।  

আপনারা অবশ্যই আপনাদের মূল্যবান মতামত দিতে ভুলবেন না । 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

Thanks for your comments.

close