"জলছবির আড়ালে" শ্রেয়াঙ্কি কা৺ড়ার

                  জলছবির আড়ালে:-

    শ্রেয়াঙ্কি কা৺ড়ার

                                   
ভোর বেলা পৌঁছেই মেঘের ঘনঘটা চোখে পড়ে ছিল মোহনার এখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে, টানা কাঁচের জানলায় বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির ফোঁটা গুলো ঝাপসা করে তুলেছে বাইরের দৃশ্যপট।খানিকটা জল ছবির মতো দেখতে লাগছে।দুচোখ জুড়ে স্থান পেয়েছে তৃপ্তি। 
একটা হিমেল হাওয়ার স্রোত চারিপাশ ঘিরে রয়েছে ওর। অল্প জানলা খুলতেই শরীরটা শিরশিরে উঠলো মোহনার। তাড়াহুড়ো করে বন্ধ করে দিল জানলাটা,মনটা আজ হালকা মনে হচ্ছে বহু দিন পর। পাহাড় জঙ্গল ওর ভীষণ প্রিয় তবে প্রত্যুষের ভালো লাগেে সমুদ্র তাই দুজনেরই মিলিত প্ল্যানে ওরা এসেছে বিশাখাপত্তনম।

কতদিন পর বেড়াতে আসা, একটা মুক্তির স্বাদ বড় ভালো লাগছে সব কিছু, তবুও মোহনার গহিন অন্তর হতে একটা দীর্ঘশ্বাস আপনা হতেই বেরিয়ে এলো। 
পিছন থেকে আচমকা এসে প্রত্যুষ জাপটে ধরেছে।
__'উফঃ ছাড়ো তো, এই সব কি হ্যাঁ!'
ছটকে প্রত্যুষের নাগাল থেকে সরে যেতে চাইলেও পারল না ও। ঐ পৌরুষের ক্ষমতার কাছে নিজেকে তৃণ সম মনে হলো মোহনার। 
__'কি হলো সোনা' ঘাড়ে মুখ ঘষতে ঘষতে আধো ফিসফিসিয়ে ওঠে প্রত্যুষ। 
__'প্লিজ এখন ছাড়ো আমাকে, বাইরে দেখো কত বৃষ্টি হচ্ছে, কত সুন্দর লাগছে চারপাশটা'। 
__'কিন্তু আমি তো শুধু তোমাকেই দেখব বলে এসেছি ডিয়ার! আমার কাছে তো এসো। '
__'ইশ! প্রত্যুষ কি গো তুমি'
__'আমি মানব তুমি আমার মানবী, এবার তো আসো'।
__'অ্যাই যাও তো যাও স্নানে যাও তোমার হলে তারপর আমি যাবো এরপর অল্প কিছু খেয়ে ঘুরতে যাবো দুজনে'। 
__'তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি? দেখতে পাচ্ছো না কত বৃষ্টি হচ্ছে কোথাও যাবো না, এমন বৃষ্টির ওয়েদারে হানিমুনে এসে কেউ ঘুরতে যায় না'। 
__'হানিমুন! কি যাতা বলছো? প্রত্যুষ'
__'ঠিকই তো বললাম এটা সেকেন্ড হানিমুনই তো'। 
মোহনাকে এরপর কথা বলার কোনো সুযোগ না দিয়ে প্রত্যুষ ওর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিতেই... 

ঠক-ঠক-ঠক! দরজায় কেউ এসেছে। 
__'কি অদ্ভুত!' 
এক ঝটকায় মোহনা প্রত্যুষের বাহু ভেদ করে বেরিয়ে এলো। প্রত্যুষ ঠোঁট মুছে চুল ঠিক করতে করতে একরাশ বিরক্ত নিয়ে পা বাড়ালো দরজার দিকে। 
কেয়ারটেকার রামান দাঁড়িয়ে দরজায় একগাল হাসি নিয়ে। 
__'অ্যাই রামান এসেছে জানতে চাইছে কি খাব?'
জানলার কাঁচে হাত রেখে মোহনা বলল __
'তুমি স্নানে যাও। আমি বলে দিচ্ছি '।
চোখ মুখ কুঁচকে মোহনার দিকে তাকাতে তাকাতে প্রত্যুষ বাথরুমে ঢুকে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিল। 
মোহনা ধীরে সুস্থে রামানকে লাঞ্চের অর্ডার দিয়ে, আবার এসে দাঁড়ালো জানলার সামনে বৃষ্টিটা ধরে এসেছে। বাইরে সমুদ্র ও তার পিছনের পাহাড় ঘেরা জঙ্গলটা ওকে ভীষণ রকম টানছে। 
আচ্ছা বাবাই কি করছে এখন? ওর এখন স্কুলের মিডট্রাম টেস্ট চলছে।আর অরণ্য... আজ অরণ্যের শরীরটা কেমন আছে? 
এভাবেই নিষিদ্ধ অভিযানের যে অভিযাত্রী হতে হবে মোহনাকে কোন দিন ও ভাবতে পারেনি কখনও না। 
কি চমৎকার প্ল্যানটাই না করেছে প্রত্যুষ কোথাও এতটুকুও ফাঁক নেই। যা ঘটছে বা আরও যা যা ঘটবে তার জন্য তো দায়ী অরণ্য নিজেই। মোহনা তো ভাবেনি কখন যে জীবনে এই সব করবে। 
প্রত্যুষ অরণ্যের কম্পানির ম্যানেজার বলতে গেলে ঐ সব, কতটুকুই বা কাজ করত অরণ্য?প্রত্যুষ আজ ওর বুদ্ধি মেধা আর পরিশ্রমের জোরে ডুবতে বসা কম্পানিকে একা হাতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রত্যুষ অরণ্যের থেকে বয়সে অনেকটা ছোটো। 
তবে একটা বিশেষ গুন ছিল অরণ্যের বেশী ভাগ সময়টা যেহেতু ওকে এক জায়গায় বসে কাটাতে হতো , তো ছবি আঁকতে শুরু করে ও। আর সত্যিই দারুন ছবি আঁকে মানুষটা। প্রত্যুষও ওর ছবির ভক্ত। 
প্রথম যেদিন প্রত্যুষ ওদের বাড়ি এসে ছিল প্রথম দেখাতেই মোহনার ছেলেটাকে ভালো লেগে যায়। স্মার্ট, হ্যান্ডসাম আর সর্বোপরি ওর মুখের দুষ্টু হাসিটাও মোহনার নজর এড়ায়নি। মোট কথা প্রথম দেখাতেই মোহনার মনে জোয়ার আনে প্রত্যুষ। তারপর প্রত্যুষের অরণ্যকে বলা__
' আজ বুঝলাম অরণ্যদা তোমার পোট্রেট আঁকার প্রেরণা কে?'
অরণ্য শুনে হেসেছিল,শুধুই খিলখিলিয়ে শিশুর মতো হেসে ছিল।

অ্যাকসিডেন্টটা ঘটে ছিল বিয়ের ঠিক দু'বছরের মাথায়, তখন বাবাই মোহনার গর্ভে, ঐ ঘটনার পর অরণ্য প্রাণে বেঁচে গেলেও কোমরের নীচ থেকে শরীরের সমস্ত নার্ভ কাজ করা বন্ধ করে দেয়, ফলে ও চিরদিনের জন্য হুহিলচেয়ারের অধীনে চলে যায়। 
তারপর থেকেই কম্পানির অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হতে থাকে। কত দিন আর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সে সংসার চলে যে যতই থাকুক না কেন ,
এরপর বাবাইয়ের জন্ম ওর স্কুলে ভর্তি ক্লাসে ওঠা। অরণ্য একজন দক্ষ ম্যানেজারের খোঁজ করছিল অনেক দিন ধরেই এরপর বছর চারেক পর মনের মতো এক ম্যানেজার পাওয়া আর সেই হলো মোহনার প্রত্যুষ। 
এরপর দিনদিন প্রত্যুষের ওদের বাড়ি আসা যাওয়া, ওদের পরিবারের একজন হয়ে ওঠা বাবাই ওর আঙ্কেলকে খুব পছন্দ করে। বাবা থাকলেও তাঁর নিজের শরীরের অক্ষমতার জন্য সেভাবে সময় দিতে কোনদিন পারেনি অরণ্য, সেগুলো প্রত্যুষই পূরণ করতে থাকে। 
এরপর প্রায়ই ওরা তিনজন রাতে রঙীন জলের গ্লাস হাতে নিয়ে বসেছে, এমন অনেক দিন হয়েছে যে প্রত্যুষ রাতে ওদের বাড়ি থেকে গেছে। 
এমনই এক রাতে মাতাল হয়ে প্রত্যুষ অরণ্যকে বলে বসে__
' আচ্ছা অরণ্য দা সারা জীবন একই বউ বা বরের সঙ্গে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাটা কি খুব জরুরী সে তাতে অসুখী জেনেও'।
অরণ্যও নেশাতুর জড়ানো গলায় বলে ওঠে__
'তা নয়, তবে সমাজ সংসারের তো বাসিন্দা আমরা তাই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয়, তুমি ব্যাচেলার মানুষ তাই এই সব এত জানো না, নয় তো সমাজ বহিষ্কারের ভয় থাকে বুঝলে'। 

__'ভয়টা কিসের? কে কি বলবে? আরে ঐ সবে তো কান না দিলেই হয়, যত্তোসব বোগাস পুরানো ধ্যান ধারণা।'
__'আরে বাবা প্রত্যুষ তুমি পাবেই বা কোথায় এমন নারী'?
প্রত্যুষ এবার মোহনার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে নেয়, আর বলে__ 
'আর যদি পাই'। 
না চোখ এড়ানো সম্ভব ছিল না অরণ্যের, অরণ্য অট্টহাস্যের মধ্যেই বলে ওঠে__
'ও তোমার মোহনাকে মনে ধরেছে? আমার আপত্তি নেই,তোমার বৌদি রাজি যখন...আমি সংকীর্ণ মনস্ক নই'। 
মোহনার হালকা নেশাগ্রস্ত অবস্থাতে থাকলেও সে ঝাঁঝিয়ে ওঠে__ 
'দুটোই মাতাল হয়ে গেছে একেবারে রাখো গ্লাস রাখো যাও যাও শুয়ে পড়ো গিয়ে অসহ্য!! '

বলতে গেলে এই ছিল সূচনা। মোহনা তার মনের আগুন কে ধীরে ধীরে চাপা দিয়ে এক প্রকার নিভিয়েই রেখেছিল সে এত গুলো বছর। অরন্যের সঙ্গে ওর বিয়েটা অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ,তবে প্রেমের ছোঁয়া পেয়েছিল ও নব দাম্পত্য জীবন সুখেরই ছিল , বিয়ের প্রথম প্রথম সব কিছু সুন্দর কাটলেও হঠাৎ অ্যাক্সিডেন্ট ওদের সংসারে ছন্দপতন ঘটায় শরীরের খিদেকে একপ্রকার জোর করে মেরে ফেলে মোহনা, তবুও নিজেকে আয়নায় সামনে দেখে প্রায় দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে লুকিয়ে, তিরিশ পেরিয়ে গেলেও আজও ওর ঔজ্জ্বল্যতা নিভে যায়নি। 
সেই রাতের পর থেকেই প্রত্যুষের বাড়িতে অতর্কিত হানা দেওয়া বাড়তে থাকে, অরণ্য বেশী ভাগ সময়ই একা উপরে ওর স্টুডিও কাম বেডরুমে থাকে।তাই প্রথম প্রথম প্রত্যুষ এলে ওকে নীচে নিয়ে আসতো মোহনা ওর বৃন্দা পিসির সাহায্যে। বৃন্দা পিসি ওর চব্বিশ ঘন্টার সঙ্গী ন'মাসে ছ'মাসে বাড়ি যায়।বাজার দোকান রান্না ঘরদোর সব ওর দায়িত্বে। 
কিন্তু কিছুদিন এমন চলার পর একদিন অরণ্য হাসিমুখে মোহনাকে বলল প্রত্যুষ এলে সব সময় ওকে নীচে নিয়ে আসার কোনো দরকার নেই, অফিসিয়াল কাজ হলে প্রত্যুষ এমনিতেই উপরে চলে আসে। আর এত মানসিক দন্দের কি আছে, একা একা থাকো সব সময় প্রত্যুষ এসে একটু যদি সঙ্গ গিয়ে যায় তোমাকে তো যাক না'। 
এরপর একদিন ভর দুপুরে প্রত্যুষের আগমন বৃন্দা পিসি বাবাইকে স্কুল থেকে আনতে গেছে তখন। 
দরজা খুলতেই প্রত্যুষ এসে আঁকড়ে ধরে ওকে, 
মোহনা প্রথমে বাঁধা দেয়, তবে প্রত্যুষও ওকে বাহু ডরে আঁকড়ে নিয়ে বলে চিন্তা করো না অরণ্যদা কিছু বলবে না, আর বাঁধা দিতে পারেনি মোহনা, ওর ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দিয়ে ছিল প্রত্যুষ এই ভাবেই জেগে ওঠে মোহনার ভিতরের ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।
এরপর থেকে এই সব চলতে থাকে প্রায় দিনই কিন্তু ওরা শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তটা নিল সেটা ঠিক তো?যদি সঠিক সিদ্ধান্তই হয় তো তবুও মনে কাঁটা কেনো বিঁঝে আছে? 
প্রত্যুষের সব বিষয়েই বাড়াবাড়ি...অরণ্যের সঙ্গে এই সব করার কি খুব প্রয়োজন ছিল...?
...

এই যে ম্যাডাম নিশ্চল পাথর হয়ে গেলেন নাকি?উঠে পড়ুন গিজার অন আছে যান তাড়াতাড়ি স্নানটা সেরে নিন। প্রত্যুষ মাথা মুছতে মুছতে বেড়িয়ে এলো ভাবনায় ছেদ পড়লো মোহনার। 
উষ্ণ জল ধারা শরীরে পড়তেই সমস্ত ক্লান্তি, অপ্রীতিকর চিন্তা মাথা থেকে উবে গেল মোহনার।
দরজায় টোকা পড়লো
__'কি হলোটা কি প্রত্যুষ?'
__'বলছি শোনোনা আমি নীচে যাচ্ছি,ভীষণ খিদে পাচ্ছে দেখি কতদূর এগোল ওদের রান্না তুমি তাড়াতাড়ি চলে এসো স্নান করে। '
__'ঠিক আছে যাও, আমি যাচ্ছি, আর শোনো না কালো ট্রোলিতে প্রথম চেনেই আমার পোশাক আছে লাল প্লাজো আর লাল সাদা কুর্তিটা বার করে দিয়ো যাও'। 
__'উফঃ নিজের জামা কাপড়ও নিজে নেবে না, পারব না আমি তুমিই বার করে নিও আমি নিচে গেলাম'। 
__প্রত্যুষ প্লিজ! প্রত্যুষ প্রত্যুষ.... 
স্নান করে টোয়ালে জড়িয়ে রাগান্বিত হয়ে বেরিয়েই মোহনার মুখে হাসি ফুটে উঠলো, এই তো ছেলেটা জামা বার করে দিয়েই গেছে, শুধু শুধু আমাকে রাগাচ্ছিল।
চটপট তৈরি হয়ে নিচে চলে এলো ও প্রত্যুষ সিগারেট হাতে টিভির সামনে বসে ওকে দেখেই বলে উঠলো__
'আরে এসেছো চলো চলো আর পারছিনা খুব খিদে পেয়েছে'। 
খাওয়ার শেষে ঘুরতে যাওয়ার আগে আরও একবার উপরে গেল মোহনারা, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টিপ পড়তে পড়তে মোহনা প্রত্যুষকে বলল__
'জামা বার করে দিতে বলছিলাম বলে এতো ঢং কেনো করছিলে গো? সেই তো বার করেই দিয়েই গেছিলে'। 
মোহনার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লো প্রত্যুষ __'আমি? কই না তো? আমি তো বার করিনি'।
প্রত্যুত্তর দেওয়ার আগেই ফোন বেজে উঠলো মোহনার বাবাইয়ের ফোন...
       এই প্রথম ছেলেটাকে ছেড়ে এতো দুরে এসেছে ও, বাড়িতে বলে এসেছে কম্পানির জরুরী কাজে ওরা যাচ্ছে, অরণ্যের অবর্তমানে এখন মোহনাই তো কম্পানি চালাবে। 
অরণ্যের অবর্তমানে... না অরণ্য এখন বর্তমানেই রয়েছে তবে কোমায়। ঠিক দুটো সপ্তাহের আগের ঘটনা। আবারও গ্লাস হাতে বাসার প্ল্যান হয় ওদের তিন জনের,ড্রিংকস সঙ্গে স্ন্যাক্স বানানোর জন্য নীচে কিচেনে যায় মোহনা হঠাৎ পাহাড় ভাঙা আর্ত চিৎকার শুনতে পায় ও, হুম এই শব্দটা যে বড় কাঙ্খিত ছিল মোহনার কাছে।

ফোনটা রাখতেই দেখে প্রতুষ্যের চোখে অধৈর্যের ছাপ।
__'দশ বছর হয়ে গেছে ছেলের একটু তো আতুপুতু বন্ধ করো, বড় হতে দাও ওকে'। 
ঝঙ্কার দিয়ে ওঠে মোহনা
__' চুপ করো তো তুমি, যাও নিচে গিয়ে দেখো গাড়ি এলো কিনা আমাদের, আমি পাঁচ মিনিটের মধ্যে আসছি'। 
চুপচুপ ভিজে বেড়ালের মতো নিচে নেমে গেল প্রত্যুষ, প্রকৃতির ডাকে টয়লেটে গেল মোহনা। কিন্তু একি ভিতরে আটকা পড়ে গেল নাকি ও, দরজাটা এই ভাবে জাম হয়ে গেল কিভাবে? সকালেও তো স্নানের পরে বেরিয়ে ছিল কই তখন তো হয়নি এমন,এত শক্ত করে এঁটে যাওয়ার তো কথা না, 
আরে... এতো মনে হচ্ছে বাইরে থেকে কেউ ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়েছে...
__'প্রত্যুষ! প্রত্যুষ! এটা কি ধরণের অসভ্যতা দরজাটা খোলো এখুনি'।
বাথরুমের ভিতরটা অস্বাভাবিকতা রকম ঠাণ্ডা, মনে হয় কাঁচ পাথর লাগানোর ফলে, আয়নার গায়ে কুয়াশা জমাট বেঁধে আছে। ঠাণ্ডায় মনে হলো হাত-পা জমে যাবে ওর,ঐ কি প্রত্যুষ গান গাইছে আমাকে বাথরুমে বন্ধ করে রেখে,হুম গান গাইছে তো...না না এটা তো..এটা তো প্রত্যুষের গলা না...গলাটা খুব চেনা চেনা কিন্তু কার? মাথায় আসছে না...গলার সর্ব শক্তি দিয়ে মোহনা চিৎকার করে উঠলো__'প্রত্যুষ!'
ও কি কেউ রুমের দরজা খুলে ভিতরে আসছে.. আবার চিৎকার করে উঠলো মোহনা__'প্রত্যুষ! প্লিজ দরজাটা খোলো'।
এবার একটা ছুটন্ত পায়ের শব্দ পেলো মোহনা...হেঁচকা টান দিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা খুলে দিল কেউ বেরিয়ে দেখল প্রত্যুষ দাঁড়িয়ে অবাক চোখে। 
ওকে পুরোটা খুলে বলতে ও বলল_ ' আরে কাঠের দরজা এমন জাম তো হয়ে যেতেই পারে, তুমি আসছো না দেখে ভাগ্যিস আমি আসলাম,নাহলে কে কতক্ষন যে এভাবে থাকতে'!! 
না ওকে আর গানের ব্যাপারটা কিছু বলল না মোহনা। এরপর কফি খেয়ে বেড়িয়ে পড়ল ওরা তবে এত আনন্দ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ছবি তোলার মধ্যেও মনটা ভারী হয়ে রইল ওর। 
এই পাহাড়তলি অঞ্চলে একটা বড় সমস্যা হলো ফোনের নেটওর্য়াক পাওয়া যায় না। বাবাইয়ের ফোন আসতে ধরতে ধরতেই কেটে গেল ফোনটা, উল্টো দিক থেকে যে ফোন করা হবে তারও উপায় নেই, আর প্রত্যুষকে চেষ্টা করে দেখার কথা বলতে সে কথাটা ফুৎকারে উড়িয়ে দিল।
হোটেলে রাত করে ফিরে খেয়ে দেয়ে ওরা চলে গেল নিজেদের ঘরে,অদিম খেলায় মেতে থাকল অনেক রাত পর্যন্ত, বিয়ের প্রথম প্রথম এই সব হতো, সেদিন গুলোর কথা মনে পড়ে গেল মোহনার,তারপর নিজেদের অজান্তেই ঘুমে তলিয়ে গেছে একটা সময়। তখন বোধহয় ভোর রাতই হবে হঠাৎ কেমন যেন অস্বস্তিতে ঘুমটা ভেঙে গেল ওর, একটা কেমন যেন গন্ধ ছাড়ছে... হ্যাঁ এতো তেল রঙের গন্ধ বুকটা ধক! করে উঠলো মোবনার এই গন্ধ তো অরণ্যের স্টুডিওর গন্ধ এখানে এলো কিভাবে? 
চোখ পড়ল বাথরুমের দিকে, প্রত্যুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, বাথরুমের লাইটটা জ্বলছে, অথচ মোহনার স্পষ্ট মনে আছে ও বন্ধ করে এসে ছিল আলোটা, তবে কি প্রত্যুষ উঠে ছিল রাত্রে বন্ধ করে আসতে ভুলে গেছে....? 
বিছানা থেকে নামল মোহনা আলোর সুইচটা ওদের বিছানার থেকে দু'হাত দুরে বন্ধ করে দিল আলোটা, ঘরটার তাপ মাত্রা হিমাঙ্কের নীচে মনে হচ্ছে এত অতিরিক্ত ঠাণ্ডা পড়ার কথা নয় তো তবে? 
একি! রুমের দরজাটা কোথায়? দরজার জায়গায় নিরেট দেওয়াল, এ কি করে হতে পারে?
__'প্রত্যুষ! প্রত্যুষ! ওঠো ওঠো শুনছো তাড়াতাড়ি ওঠো ঘুম থেকে...'
__'দেখো দেখো এ সব কি হচ্ছে?'
একি আলো জ্বলছেনা কেনো? ডিম আলোটা তো জ্বলছে বড় আলো গুলো জ্বলছেনা কেনো? 
ঐ দিকে তেল রঙের গন্ধটা আবার আসতে শুরু করেছে ঐ দিক থেকে আসছে ঐ তো বাথরুম থেকে... ঘরের জানলা দরজা সব নিরেট দেওয়ালে পরিণত হয়েছে... দম বন্ধ হয়ে শেষ হয়ে যাবে নাকি মোহনা আর প্রত্যুষ..!! 
আরে প্রত্যুষের কি হলো এতো ঘুম মানুষে ঘুমাতে পারে? 
কিন্তু একি! প্রত্যুষের শরীর ঠাণ্ডা বরফ কেনো? কই ও তো শ্বাস নিচ্ছে না... 
__'প্রত্যুষ প্রত্যুষ!
এ কি হলো গো তোমার...'
কঁকিয়ে উঠলো মোহনা... ওর শরীরটাও যেন ধীরে ধীরে ঠাণ্ডায় অবশ হয়ে যাচ্ছে, শাস্তি শাস্তি এ তো ওদের পাপের শাস্তি... কিন্তু বাবাইয়ে কি হবে? ওর তো জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে হে ভগবান আমাকে ক্ষমা করো ক্ষমা করো তুমি আমাকে...আমার বাচ্চাটা ভেসে যাবে... 
ও কি...!! বাথরুমের আলোটা আবার জ্বলে উঠলো, একটু একটু করে খুলে যাচ্ছে বাথরুমের দরজাটা... তেল রঙের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘর জুড়ে...।

           আজ আদালতের রায় অনুসারে দীর্ঘ সাত বছরের কারাদণ্ড ঘোষণা করা হলো মিসেস মোহনা রায়চৌধুরীর জন্য নিজের স্বামীর খুনের অপরাধে। বাবাই মাকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছে, 
__'মাম্মাম তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না, আমি সারাক্ষণ গুড হয় হয়ে থাকব', 
বৃন্দা পিসির চোখে আজ মোহনা দেখলো ঘৃনা মিশ্রিত বিস্ময়ের দৃষ্টি,বাবাইয়ের হাত ধরে টেনে নিয়ে চলে গেল সে, মোহনার বাব,মা,ভাই আজ তাকে চিরদিনের মতো ব্রাত্য ঘোষণা করল বিনা বাক্য ব্যয়ে,মোহনা জানে আর কোন কিছু আগের মতো হবে না কোন দিন ও না। 
     সেই ভয়ংকর রাতে শেষ অঘটন ঘটার আগের ও জ্ঞান হারায় মোহনা়,পরের দিন ওদের সাড়া শব্দ না পেয়ে হোটেল কতৃপক্ষ রুমের দরজা ভেঙে অজ্ঞান অবস্থায় মোহনাকে উদ্ধার করে আর প্রত্যুষকে পাওয়া যায় মৃত অবস্থায়। পোসমার্টাম রির্পোট অনুযায়ী ঘুমের মধ্যেই হার্টফেল করে মারা গেছে প্রত্যুষ। 
তারপর হাসপাতালে ট্রমার ঘোরে নিজেদের ঘৃণ্য অপরাধের কথা স্বীকার করে মোহনা।
সেইদিন তিন জনের গ্লাস হাতে সন্ধ্যা উদযাপন করাটা ছিল আসলে মোহনা ও প্রত্যুষের প্ল্যানের অঙ্গ, মোহনা তার স্বামীর ক্ষতিসাধনে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত না থাকলেও পরোক্ষ ভাবে ছিল।সে জানত নিচে বসে ন্স্যাক্স সহ ড্রিংক করার টোপ দিয়ে সিঁড়ি থেকে নামানোর নাম করে, হুইল চিয়ার থেকে ফেলে দেবে অরণ্যকে প্রত্যুষ, তারপর সেটাকে অ্যাকসিডেন্টের তকমা দেওয়া কোনো কঠিন কাজ ছিল না।প্ল্যান অনুসারেই সবটা হয় তবুও প্রাণে বেঁচে যায় অরণ্য,কোমায় চলে যায় ও আর সেই অবস্থাতেই ওকে হাসপাতালে রেখে ওর আর প্রত্যুষের মিথ্যা কাজের কথা বলে বেড়াতে আসা।
সে দিন বিকালে বিশাখাপত্তনমে বেড়ানোর সময় বাবাই মাকে ফোন করে তার বাবার মৃত্যুর খবরটা দেওয়ার জন্য,হ্যাঁ সেদিনই দুপুরে মারা যায় অরণ্য, কিন্তু নেটওর্য়াকের গণ্ডগোলর জন্য সঠিক সময়ে মৃত্যুর খবরটা আর পায়নি মোহনা প্রত্যুষ।।

সংগ্রহ :- ভুত ভূতুম গ্রুপ
Writer's Facebook profile -

Post a Comment

0 Comments

close