আজাদ হিন্দ ফৌজের বীরাঙ্গনা , প্রকাশ রায়

          আজাদ হিন্দ ফৌজের বীরাঙ্গনা 

                              প্রকাশ রায়

লক্ষ্মী সেহগল 

জন্ম:- ২৪ অক্টোবর ১৯১৪ - মৃত্যু:- ২৩ জুলাই ২০১২


                 লক্ষ্মী স্বামীনাথন জন্মগ্রহণ করেন ২৪ অক্টোবর ১৯১৪ সালে অবিভক্ত ভারতের মাদ্রাজে। তার পিতার এস. স্বামীনাথন মাদ্রাজ হাইকোর্টে অপরাধ আইন চর্চা করতেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম কর্মী ছিলেন  লক্ষ্মী সেহগল। তিনি সিঙ্গাপুরে এক বিশিষ্ট স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ ছিলেন। তার মা এ.ভি. অম্মুকুট্টি যিনি পরবর্তীতে অম্মু স্বামীনাথনরূপে পরিচিত, তিনি একজন সমাজকর্মী ছিলেন। পাশাপাশি কেরালার পালঘাট এলাকার আনাক্কারায় ঐতিহ্যবাহী বদক্কাথ পরিবার থেকে স্বাধীনতা কর্মী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। লক্ষ্মী সেহগল পরে তার ডাক্তারি চাকরি ছেড়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের রানি ঝাঁসি রেজিমেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 


                 লক্ষ্মী সেহগল ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী সংগঠন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন। প্রথম জীবনে চেন্নাইয়ের ত্রিপলিক্যান এলাকার সরকারি কস্তুর্বা গান্ধী হাসপাতালে ডাক্তার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৪০ সালে পি.কে.এন. রাও নামের একজন পাইলটের সাথে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটে। পরে ১৯৪৭ সালে লাহোরে পুণরায় কর্ণেল প্রেম সেহগলের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। সিঙ্গাপুরে থাকাকালীন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ভারতীয় জাতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ১৯৪২ সালে সিঙ্গাপুরের পতনের ফলে জাপানী বাহিনী সিঙ্গাপুর দখল করে।


                 লক্ষ্মী সেহগল আহত যুদ্ধবন্দীদের সেবাকালীন দেখতে পান যে তাদের অনেকেই ভারতীয় স্বাধীনতা সেনাবাহিনী গঠনে বেশ আগ্রহী। সিঙ্গাপুরে তখন অনেক জাতীয়তাবাদী ব্যক্তিত্ব হিসেবে কে.পি. কেসভা মেনন, এস. সি. গুহ এবং এন. রঘবন একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করেন। সুভাষচন্দ্র বসু ২ জুলাই, ১৯৪৩ সালে সিঙ্গাপুর গমন করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নারী রেজিমেন্ট গ্রহণের কথা উল্লেখ করেন যাতে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীরা অংশগ্রহণ করবে। লক্ষ্মী সেহগাল এ বিষয়টি শোনেন এবং নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু'র নারী রেজিমেন্ট গঠনের খসড়া নীতিমালা সম্পর্কে অবগত হন। এ নারী বাহিনীই পরবর্তীকালে ইতিহাস বিখ্যাত ঝাঁসির রানী বাহিনী নামে পরিচিতি পায়। 


                 লক্ষ্মী সেহগল ওরফে ডঃ লক্ষ্মী স্বামীনাথনও ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী নামে সারাজীবন পরিচিতি পান। নেতাজীর উদাত্ত আহ্বানে অনেক নারী বিভিন্ন ব্রিগেডে অংশ নেয়। আজদ হিন্দ ফৌজ জাপান সাম্রাজ্যের সেনাবাহিনীর সাথে বার্মা অভিমুখে ডিসেম্বর, ১৯৪৪ সালে রওয়ানা দেয়। কিন্তু মার্চ, ১৯৪৫ সালে প্রবল যুদ্ধে পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরফলে আইএনএ নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেয় যে তাদের বাহিনী ইম্ফলে প্রবেশ করবে। ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী মে, ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং মার্চ, ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত বার্মায় কারাগারে আটক ছিলেন। দিল্লীতে আইএনএ সদস্যদের বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন তিনি অবিভক্ত ভারতে ফিরে আসেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরবর্তীকালে ১৯৭১ সালে লক্ষ্মী সেহগাল সিপিআই (এম)-এ যোগ দেন ও রাজ্য সভার দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। 


                 লক্ষ্মী সেহগল বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮১ সালে সিপিআই (এম)-এর অখিল ভারতীয় জনবাদীমহিলা সমিতির নারী শাখার প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন বিধায় বিভিন্ন দলীয় কর্মকাণ্ড ও প্রচারণায় প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন।১৯৮৪ সালের ডিসেম্বরে ভূপালের গ্যাস দুর্ঘটনায় চিকিৎসক দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯ জুলাই, ২০১২ সালে ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী সেহগাল হৃদযন্ত্রজনিত রোগে আক্রান্ত হন। অতঃপর ৯৭ বছর বয়সে ২৩ জুলাই, ২০১২ সালে কানপুরে মৃত্যুবরণ করেন।


(তথ্যসূত্র সংগৃহীত কপি)


প্রকাশ

Post a Comment

0 Comments

close